শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন

টাকা খরচ করে আত্মহত্যা করতে আসেন!

সুন্দর এই পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা আছে, আপনি যত বড় সাহসীই হন না কেন, সেসব স্থানে এক মুহূর্তও কাটাতে চাইবেন না। তেমনই একটা জায়গা হলো জাপানের ‘সি অফ ট্রি’ নামের একটি বন। যেখানে কিছুদূর হাঁটলেই দেখতে পাবেন গাছগুলোর ডালে মানুষের কঙ্কাল ঝুলছে! প্রতি বছর এখানে প্রচুর মানুষ আত্মহত্যা করতে আসেন! কেউ কেউ তো অনেক দূর দেশ থেকে টাকা খরচ করেও মরতে আসেন! কেননা, মানুষ নিরিবিলিতে মরতে পছন্দ করেন।

মাউন্ট ফুজির পাদদেশে অবস্থিত এই বনটির নাম আওকিগাহারা (Aokigahara)। ওপর থেকে বা বিস্তৃত পটভূমি থেকে দেখলে জায়গাটিকে সমুদ্রের মতো লাগে বলে অনেকে একে ‘সি অফ ট্রি’ (Sea of tree) বলেও অভিহিত করে থাকেন। কিছু অদ্ভুত পাথর এবং কোন প্রাণের অস্তিত্ব না থাকাতে সব সময় সুনসান নীরব এ বনটি বর্তমানে পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। জাপানি পুরান মতে, এ বনে প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায় এবং এটি আত্মহত্যা করার জায়গা হিসেবে বিবেচিত। এই বন থেকে প্রতি বছর শতাধিক মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে মাউন্ট ফুজির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে যে লাভা ছড়িয়েছিল তার ওপর এই অরন্য তৈরি হয় মাউন্ট ফুজির উত্তর পশ্চিম প্রান্তে। এই অরন্য মূলত বিশ্বের সবচেয়ে বেশী আত্মহত্যাপ্রবন এলাকাগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে৷ জাপানিদের মতে, অতীতে সামুরাই রা আত্মহত্যা করতে এই জঙ্গলে আসতেন পরে বৃদ্ধ পিতামাতাকে এই ধরনের জঙ্গলে ছেড়ে আসার চল ছিল।

মূলত এই আত্মহত্যার সূত্রপাত হয়- একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মৃত্যুর পর থেকে। যিনি ওই জঙ্গলে গিয়েছিলেন শুদ্ধিকরণের জন্য, যা পরবর্তীতে বাকি সন্ন্যাসীদেরও আকর্ষণ করতো। জাপানিদের মতে, মৃত্যুর জন্য সবচেয়ে পুণ্যকর্ম হলো আত্মহত্যা করা! আবার এও মনে করা হয় যে, মাউন্ট ফুজি হলো স্বর্গে যাবার রাস্তা, তাই অনেকে এই জঙ্গলে আত্মহত্যা করতে আসেন রাতারাতি স্বর্গ লাভের উদ্দেশ্যে।

বনটি তাই জাপানিদের কাছে আত্মহত্যার সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা এবং সারা পৃথিবীতে দ্বিতীয়। আত্মহত্যার জন্য আমেরিকার সান ফ্রন্সিসকোর গোল্ডেন ব্রিজ-এর পরই এর অবস্থান। জাপান সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে ১০০ জন করে আত্মহত্যা করতে আসেন এই বনে। কখনও কখনও সংখ্যাটা আরও বেড়ে যায়। মূলত মার্চের সময়টাতে আত্মহত্যার মাত্রা বেড়ে যায়, যখন জাপানে অর্থনৈতিক বর্ষপূর্তি ধরা হয়।

উইকিপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালে প্রায় ২৪৭ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেন যার মধ্যে ৫৪ জনই স্বর্গের পথে আরোহন করতে সক্ষম হন৷ জাপান সরকার চেষ্টা করে যাতে আসল হিসাব বাইরে না আসে। কারণ তাতে এই ধরনের কর্মের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যেতে পারে। আত্মহত্যা করতে আসা লোকেরা শুধু গলায় দড়িই দেয় না, তারা অনেক সময় অতিরিক্ত ড্রাগ নিয়েও আত্মহত্যা করে থাকে। অনেক সময় এইসব লোককে বসে থেকে মৃত্যুবরণ করার কারণে তাদের মৃতদেহকে খুঁজে পাওয়াও মুস্কিল হয়ে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, জঙ্গলে ঢোকার পার্কিং লটে দীর্ঘদিন ধরে কোনো কোনো গাড়ি পড়ে আছে। যার অর্থ যিনি গিয়েছেন তিনি আর ফিরে আসেন নি। এই জঙ্গলে যদি আপনি হাইকিং করতে চান, তবে আপনাকে এক ধরনের টেপ ব্যবহার করতে হয়, যা আপনি গাছে গাছে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন এবং ওই টেপ অনুসরণ করেই আবার ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই এই টেপের শেষপর্যন্ত হয় কোনো মৃতদেহ অথবা তাদের ফেলে যাওয়া জিনিস পাওয়া যায়।

এছাড়া আপনি গাছে টাঙানো সুইসাইড নোটও পেতে পারেন, দীর্ঘদিন ধরে পচে শেষ হওয়া কঙ্কাল ইত্যাদিও দেখতে পাওয়া অস্বাভাবিক নয় এখানে।

সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো- আপনি এখানে কোনো GPS বা কম্পাসের ব্যবহার করে সুবিধা পাবেন না। কারণ যেহেতু এই জায়গা লাভার ওপর তৈরি তাই মাটিতে লোহার আধিক্য থাকায় কম্পাস কাজ করে না এবং মানুষ চিরতরে হারিয়ে যায়।

উইকিপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, ১৯৫০ সাল থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারের মতো জাপানি এখানে আত্মহত্যা করেছেন। কেবল ২০০২ সালেই ৭৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এখান থেকে, যা ১৯৯৮ সালের উদ্ধার করা ৭৪ জনের চেয়ে বেশি। ২০০৩ সালের দিকে আত্মহত্যার হার ১০০ এর বেশি হয়ে যায় এবং তার পর থেকে জাপানি সরকার আত্মহত্যার হার প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ২০০৪ সালে ১০৮ জন লোক এখানে আত্মহত্যা করে, ২০১০ সালে ২৪৭ জন লোক আত্মহত্যার চেষ্টা করে যার মধ্যে ৫৪ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়। মার্চের সময় আত্মহত্যার হার বেড়ে যায়। ২০১১ সালের দিকে যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের অধিকাংশ ফাঁসি অথবা বেশি পরিমাণে মাদক নিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

১৯৭০ সালে পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও সাংবাদিকদের নিয়ে একটি দল গঠন করা হয়েছিল যাদের কাজ ছিল মৃতদেহগুলো খুঁজে বের করা এবং লোকজনকে আত্মহত্যায় অনুৎসাহিত করা। ১৯৬০ সালে সাইকো মাটসুমোটো নামক এক জাপানি লেখকের টাওয়ার অফ ওয়েবস নামে একটি উপন্যাস প্রকাশের পর থেকেই এখানে এসে আত্মাহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। এই উপন্যাসের দুটি চরিত্র এই বনে এসে আত্মহত্যা করেছিল। এর পর থেকে জাপানিরা এই বনে এসে এই আশায় আত্মাহুতি দেয় যে, তাদের সন্তানেরা পরবর্তীতে ভালোভাবে চলতে পারবে।

মৃত্যুর জন্য এই জায়গাটি বেছে নেয় কেন জানেন? যেন কেউ কখনো খুঁজে না পায়! কারণ, মানুষ যে বড় অভিমানী প্রাণী! মনোবিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, প্রতিটি সুইসাইডের রক্তে তিনটি উপাদান মিশে থাকে। যথা- ১। অভিমান, ২। হতাশা ও ৩। আত্মবিশ্বাসের অভাব।

এদিকে, বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর আত্মহত্যা করছে প্রায় দশ হাজার জন! অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ২৭ জন! অর্থাৎ এইটুকু একটা দেশে প্রতি ঘণ্টায় ১ জনের বেশি আত্মহত্যা করছে!

মানুষ এত অভিমানী? এই ব্যাপারগুলো কেন ঘটে? মানুষ সাধারণত একটি বিশেষ ঘটনায় আত্মহত্যা করে না। এই রোগটি সে তার ভেতরে অনেক দিন থেকে লালন করে। মানুষের অনুভূতি অনেক বেশি। প্রতিটি মানুষ একজন লেখক, একজন গায়ক, একজন কবি, একজন নেতা।

তাই মনে রাখতে হবে, এই পৃথিবীতে আপনার উপস্থিতি অনেক বেশি প্রয়োজন। অভিমান করে চলে যাবার জন্য আপনার জন্ম হয়নি। এখানে আপনাকে অনেক কাজ করতে হবে, কাজের মাঝেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সবার মাঝে নিজেকে স্মরণীয় করে তুলতে হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

.

করোনার সর্বশেষ খবর

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
৩৫৬,৭৬৭
সুস্থ
২৬৭,০২৪
মৃত্যু
৫,০৯৩
সূত্র: আইইডিসিআর

বিশ্বে

আক্রান্ত
৩২,৪৭১,১৩৯
সুস্থ
২২,৩৭৪,৬০৫
মৃত্যু
৯৮৭,৭১০